পাঁচটা ফ্যামিলি, পাঁচটা বাচ্চা (সবকটাই ছেলে), পাঁচটা গাড়ি। সার দিয়ে পরপর যখন চলত না, কী যে মজার লাগতো, ঠিক ছবির মতো। সবাই বলতো, কী দারুন রে তোদের গ্রুপটা। আমাদের আনন্দের জায়গা, দমবন্ধ সময়ের এক চিলতে হাওয়া। তাহলে কী নজরই লেগে গেল?? তাহলে তো ঝগড়া হতে পারতো, মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যেতে পারতো, তাবলে এরম ?? একেবারে টাটা-গুডবাই করে ওপারের পথে হাঁটা লাগানো! তোমাকে না মিস্টার পার্ফেক্ট বলতাম!! এই বুঝি পার্ফেকশনিস্টের মতো কাজ হলো সমীরণদা? কী দারুন ফাইট করছিলে, আমাদের আশা ছিল, জিতেই যাবে। আমরা কন-কল করে তোমায় ব্রাভো বলবো। কিন্তু কী হয়ে গেল, তোমায় ঘিরে যাদের দিনরাত, হাসি-কান্না, তাদের কে সামলাবে এবার?
এখন ভাবলে মনে হয়, সমীরণদা বরাবরই আলাদাই ছিল। কী গভীর দায়িত্ববোধ, সবসময় পাংচুয়াল, সবদিক বুঝে গুছিয়ে চলা, এগুলো আমাদের মধ্যে কোথায় ? নামটাও কী স্টাইলিশভাবে বলত- সমীর! আমরা ইয়ার্কি মেরে বলতাম- সমীইইর, হাওয়া কা ঝোঁকা! সমীরণদাও বেশ মজাই পেতো!

বিয়ের পর বরের প্রথম বন্ধু, যে এই আনাড়ির হাতে চা খেয়ে বাহ! বলেছিল। তারপর বিয়ে করে দোলা আর সমীরণদা আমাদের প্রথম ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। বিরিয়ানি খেতে এতো ভালবাসতো, লোকে ডাল-ভাতে বিরিয়ানি মশলা দিয়ে দিলেও গপাগপ খেয়ে নিতো। আমার বানানো আধসেদ্ধো বিরিয়ানি নিউ ইয়ার পার্টিতে মুখ বুজে খেয়ে নিল! আমি তো ভাবছি, কী দারুন বানিয়েছি। পরে নিজে মুখে দিয়ে দেখি, আলু আর মাংস সেদ্ধই হয়নি। ২০১৩ সালের কোনও একটা মাস, রাত ৯.৩০ টায় ফোন- কী করছ তোমরা? ছেলে তখন সবে বিছানায় পটি করে মাখামাখি করেছে। একহাতে ছেলেকে ধরে বিছানার চাদর সরাতে সরাতে বললাম এই কিছুনা। আমরা কিন্তু নীচে, দরজা খোলো। আমরা তখন বিছানায় চাদর পাতব, না চাদরের পটি ধোবো, নাকি ছেলেকে প্যান্ট পরিয়ে লজ্জা নিবারণ করব- দোলা-সমীরণদা কিন্তু ঢুকেই ছেলেকে কোলে নিয়ে নিলো বললো, তোমরা গোছাও সব। আমরা ওকে দেখছি। বন্ধু তো আগে থেকেই ছিলে, সেদিন থেকে যেন পরিবার হয়ে গেলে। এরপর কোথা দিয়ে জল গড়াতে গড়াতে ১০টা বছর পেরিয়ে গেল। আমরাও সাদামাটা জীবনে রাগ-দুঃখ- অভিমান নিয়ে বেশ লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম, ৫টা পরিবার এরকমই গড়িয়ে গড়িয়ে, আজ এই পার্টি, কাল ওই বার্থডে করে পেরিয়ে যাব দিন-কাল-বছর! কিন্তু, সমীরণদা তো- সবার মধ্যে আলাদা। চোখধাঁধানো কিছু করতেই হবে! তাবলে, এরকমটা আশা করিনি। আমাদের জন্যে একটু তো অপেক্ষা করতে পারতে। কালের নিয়মে সবাই একইসঙ্গে 'হরি দিন তো গেলো সন্ধে হলো' গাইতে গাইতে পরপারের প্ল্যানিংটা করতাম। ঈন্দ্রলোক না শিবলোক, কটা রুম, ভডকা না রাম, সাইট সিং, নন-ভেজ কিন্তু চাই-ই চাই। দলছুট হয়ে এগুলো করা যায়?
নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না, তোমার যে সময়ে আমাদের সবথেকে বেশি দরকার ছিলো, তখন তোমার পাশে দাঁড়াতে পারলাম না। হাসপাতালে তোমায় দেখতে যেতে পারলাম না, ওষুধের জন্যে এদোকান, ওদোকান ছুটতে পারলাম না। তুমি কিন্তু একডাকে আমাদের পাশে ছিলে, আমি আর সায়ন্তন এই দুঃখ থেকে বেরোতে পারব না যে তোমার সুখের দিনে থাকলাম, অথচ, কষ্টের সময়ে কিছুই করতে পারলাম না। কীকরে ভুলি, তুমি সায়ন্তনকে বলেছিলে, আমি সেদিন ছিলাম না, তাই তোকে ও বলতে পারল, আমি থাকলে পারতো না! এমন বন্ধুবৎসল আমাদের সদাহাস্যময় বন্ধু একা একা নির্বান্ধবের মতো চলে গেল, এটা মেনে নেওয়া যায়না। করোনা আমাদের কী সাংঘাতিক শিক্ষা দিয়ে গেল! একটা লোককে নিয়ে মান- অভিমান, রাগ-দুঃখ, সব এক মুহূর্তে শেষ। আমরা বলতাম, যতোই যা হোক, আমরা এরকমই সবাই একসাথে থাকব। তা তো হলোনা!
No comments:
Post a Comment